হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহ তাআলা ইহুদীদের দুটি দলের (বনু নাযীর গোত্র ও বনু কুরাইযাহ গোত্র) ব্যাপারে (৫). আল মায়েদার ৪১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। জাহিলিয়াতের সময় তাদের একজন অপরজনকে পরাজিত করেছিলো। যতক্ষণ না তারা একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছিলো। সে অনুসারে পরাজিত দলের মধ্যে কোন ব্যক্তির দিয়াহ নির্ধারন করা হবে। শীর্ষস্থানীয় দলের দ্বারা নিহত পরাজিত দলের মধ্যে যে কোন ব্যক্তির দিয়াহ হবে পঞ্চাশ ওয়াসক। আর পরাজিত দলের দ্বারা নিহত শীর্ষস্থানীয় দলের মধ্যে যে কোন ব্যক্তির দিয়াহ হবে একশত ওয়াসক। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় না আসা পর্যন্ত তারা তা মেনে চলে। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনে উভয় দলকেই দমন করা হয় এবং তখনও তিনি তাদের উপর জয়লাভ করেননি এবং উভয় দলের সাথেই তাঁর শান্তির চুক্তি ছিলো। অতঃপর পরাজিত দলটি শীর্ষস্থানীয় দলের (বনু নাযীর গোত্রের) একজন সদস্যকে হত্যা করে এবং যে দলটি শীর্ষস্থানীয় ছিলো তারা পরাজিত দলের (বনু কুরাইযাহ গোত্রের) কাছে এই বলে বার্তা পাঠায়, আমাদেরকে একশত ওয়াসক দিয়াহ পাঠাও। পরাজিত দলটি (বনু কুরাইযাহ গোত্র) বললো, একই ধর্মের অনুসারী এবং একই বংশের অংশীদার এবং একই শহরে বসবাসকারী দুটি উপজাতির মধ্যে কি কখনো কোনো চুক্তি হয়েছিলো যে, সে অনুসারে কারো দিয়াহ অন্যের দিয়াহর অর্ধেক হবে? আমরা শুধুমাত্র এই চুক্তি মেনে নিয়েছিলাম কারণ তোমরা আমাদের উপর এটি বাধ্য করেছিলেন এবং আমরা তোমাদেরকে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন এবং আমরা আর এই চুক্তি মেনে নেবো না। তাদের মধ্যে প্রায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো, তারপর তারা তাদের মধ্যে বিচার করার জন্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়োগ করতে রাজি হলো। অতঃপর যে দলটির শীর্ষস্থানীয় (বনু নাযীর গোত্র) ছিলো তারা বুঝতে পেরেছিলো, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদেরকে এমন কোনো ফয়সালা দেবেন না, যাতে তারা তাদেরকে যা দিয়েছে, তার দ্বিগুণ দিতে হবে। আর তারা ঠিক ছিলো। তারা কেবল এই চুক্তিটি গ্রহণ করেছিলো, কারণ আমরা তাদের উপর এটি বাধ্যতামূলক করেছি। সুতরাং তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এই বিচার পাঠাও যাতে তিনি কী ফয়সালা করেন, আমরা তা জানতে পারি। তিনি যদি তোমাদেরকে তা দেন, যা তোমরা চাও, তবে তাঁকে বিচারক মেনে নিবে। আর তিনি যদি তোমাদেরকে তা না দেন, যা তোমরা চাও, তবে তাঁকে বিচারক মেনে নিবে না। তারা একজন মুনাফিককে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠালো যাতে তারা জানতে পারে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতামত কি। ঐ মুনাফিক যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন, তখন আল্লাহ তাঁর রসূলকে অবহিত করলেন যে, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি এবং আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত গুলো অবতীর্ণ করলেন,
۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ لَا يَحۡزُنكَ ٱلَّذِينَ يُسَٰرِعُونَ فِي ٱلۡكُفۡرِ مِنَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ ءَامَنَّا بِأَفۡوَٰهِهِمۡ وَلَمۡ تُؤۡمِن قُلُوبُهُمۡۛ وَمِنَ ٱلَّذِينَ هَادُواْۛ سَمَّٰعُونَ لِلۡكَذِبِ سَمَّٰعُونَ لِقَوۡمٍ ءَاخَرِينَ لَمۡ يَأۡتُوكَۖ يُحَرِّفُونَ ٱلۡكَلِمَ مِنۢ بَعۡدِ مَوَاضِعِهِۦۖ يَقُولُونَ إِنۡ أُوتِيتُمۡ هَٰذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمۡ تُؤۡتَوۡهُ فَٱحۡذَرُواْۚ وَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ فِتۡنَتَهُۥ فَلَن تَمۡلِكَ لَهُۥ مِنَ ٱللَّهِ شَيۡـًٔاۚ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمۡۚ لَهُمۡ فِي ٱلدُّنۡيَا خِزۡيٞۖ وَلَهُمۡ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٞ٤١
হে প্রিয় রসূল! যারা অবিশ্বাসের মধ্যে দ্রুত ধাবিত হয়, তারা যেনো আপনাকে দুঃখ না দেয়। তাদের মধ্যে যারা তাদের মুখ দিয়ে বলে যে, “আমরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করি”, কিন্তু তাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করেনি। আর তাদের মধ্যে যারা ইহুদী, তারা মিথ্যার জন্যে শ্রবণকারী। তারা অন্য এমন এক জাতির জন্যে শ্রবণকারী, যে জাতি আপনার কাছে আসে না। তারা আল্লাহর কথাগুলোকে তার প্রকৃত স্থান থেকে সরিয়ে দেয়, সেগুলোকে তার প্রকৃত স্থানে স্থাপনের পরেও। ইহুদীরা বলে, “তোমাদেরকে যদি বিচারের রায় এই দেওয়া হয়, তবে তোমরা তা গ্রহণ করো আর যদি তোমাদেরকে এই দেওয়া না হয়, তবে তা থেকে তোমরা বিরত থেকো।” আল্লাহ যাকে পরীক্ষায় ফেলতে চান, তাহলে তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাচানোর জন্যে আপনার কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই। এরাই তারা, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ চান না যে, তাদের হৃদয় সমূহ পবিত্র হোক। এদের জন্যে এই দুনিয়ার মধ্যে লাঞ্ছনা রয়েছে আর পরকালে এদের জন্যে আরো কঠোর শাস্তি রয়েছে। [৫ : ৪১]
سَمَّٰعُونَ لِلۡكَذِبِ أَكَّٰلُونَ لِلسُّحۡتِۚ فَإِن جَآءُوكَ فَٱحۡكُم بَيۡنَهُمۡ أَوۡ أَعۡرِضۡ عَنۡهُمۡۖ وَإِن تُعۡرِضۡ عَنۡهُمۡ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيۡـٔٗاۖ وَإِنۡ حَكَمۡتَ فَٱحۡكُم بَيۡنَهُم بِٱلۡقِسۡطِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ٤٢
ইহুদীরা অতি আগ্রহের সাথে মিথ্যা শোনে এবং প্রাণভরে হারাম খায়। সুতরাং তারা যদি আপনার কাছে আসে, তবে আপনি তাদের মধ্যে বিচার করুন অথবা আপনি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকুন তাতে আপনার কোনো অপরাধ হবে না। আপনি যদি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকেন, তবে তারা কখনোই আপনার সামান্যতম ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি আপনি তাদের মধ্যে বিচার করেন, তবে ন্যায় ভাবে বিচার করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন। [৫ : ৪২]
وَكَيۡفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِندَهُمُ ٱلتَّوۡرَىٰةُ فِيهَا حُكۡمُ ٱللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوۡنَ مِنۢ بَعۡدِ ذَٰلِكَۚ وَمَآ أُوْلَٰٓئِكَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ٤٣
কেমন করে তারা আপনাকে বিচারক মানবে অথচ তাদের কাছে তাওরাত রয়েছে, যার মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকল বিষয়ের বিচার করার বিধান আছে? তবুও তারা এসবের পরেও সত্য থেকে ফিরে যায়! বস্তুত এরাই তারা, যারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী নয়। [৫ : ৪৩]
إِنَّآ أَنزَلۡنَا ٱلتَّوۡرَىٰةَ فِيهَا هُدٗى وَنُورٞۚ يَحۡكُمُ بِهَا ٱلنَّبِيُّونَ ٱلَّذِينَ أَسۡلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَٱلرَّبَّٰنِيُّونَ وَٱلۡأَحۡبَارُ بِمَا ٱسۡتُحۡفِظُواْ مِن كِتَٰبِ ٱللَّهِ وَكَانُواْ عَلَيۡهِ شُهَدَآءَۚ فَلَا تَخۡشَوُاْ ٱلنَّاسَ وَٱخۡشَوۡنِ وَلَا تَشۡتَرُواْ بِـَٔايَٰتِي ثَمَنٗا قَلِيلٗاۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ٤٤
নিশ্চয় আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে পথ প্রদর্শন ও আলো রয়েছে। যারা ইহুদী ছিলো, তাদেরকে আল্লাহর অনুগত নবীগণ তাওরাত দ্বারা বিধান দিতেন। আল্লাহ ভক্ত ও আলেমরা তাওরাত দ্বারা মানুষদেরকে বিধান দিতেন, যা তারা আল্লাহর গ্রন্থ থেকে নিজেদের হৃদয়ের মধ্যে সংরক্ষণ করতো। আর ইহুদীরা এসবের সাক্ষী ছিলো। সুতরাং হে ইহুদীরা, তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং তোমরা আমাকে ভয় করো। আর তোমরা আমার বাণী সমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য ক্রয় করো না। আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন, তার দ্বারা যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে বিচার করে না, তবে এরাই তারা, যারা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী। [৫ : ৪৪]
وَكَتَبۡنَا عَلَيۡهِمۡ فِيهَآ أَنَّ ٱلنَّفۡسَ بِٱلنَّفۡسِ وَٱلۡعَيۡنَ بِٱلۡعَيۡنِ وَٱلۡأَنفَ بِٱلۡأَنفِ وَٱلۡأُذُنَ بِٱلۡأُذُنِ وَٱلسِّنَّ بِٱلسِّنِّ وَٱلۡجُرُوحَ قِصَاصٞۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِۦ فَهُوَ كَفَّارَةٞ لَّهُۥۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ٤٥
আমি ইহুদীদের জন্যে তাওরাতের মধ্যে লিখে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখম সমূহের বিনিময়ে সমান জখম। আর যে কেউ এ বিনিময়কে ক্ষমা করে দেয়, তবে তা তার জন্যে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে। আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন, যে ব্যক্তি ঐ বিধান দ্বারা বিচার করে না, তাহলে এরাই হচ্ছে অন্যায়কারী। [৫ : ৪৫]
وَقَفَّيۡنَا عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِم بِعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلتَّوۡرَىٰةِۖ وَءَاتَيۡنَٰهُ ٱلۡإِنجِيلَ فِيهِ هُدٗى وَنُورٞ وَمُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَهُدٗى وَمَوۡعِظَةٗ لِّلۡمُتَّقِينَ٤٦
নবীগণের পরে আমি মারইয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়ে ছিলাম, ঈসার পূর্বে তাওরাতের মধ্যে যা ছিলো তার সত্যায়নকারী রূপে। তাঁকে আমি ইঞ্জীল দিয়েছিলাম, যার মধ্যে পথ প্রদর্শন ও আলো ছিলো। ইঞ্জীল ছিলো এমন যে, এর পূর্বে তাওরাতের সত্যায়নকারী আর পরহেযগারদের জন্যে পথ প্রদর্শন ও উপদেশ স্বরূপ। [৫ : ৪৬]
وَلۡيَحۡكُمۡ أَهۡلُ ٱلۡإِنجِيلِ بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فِيهِۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ٤٧
যারা ইঞ্জীলের অধিকারী তাদের উচিত যে, আল্লাহ ইঞ্জীলের মধ্যে যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন, ঐ বিধান দ্বারা তারা যেনো মানুষের মধ্যে বিচার করে। আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন, ঐ বিধান দ্বারা যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে বিচার করে না, তাহলে এরাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি অবাধ্য। [৫ : ৪৭]